নীরবে শরীরে বাসা বাঁধছে হেপাটাইটিস, সাবধান করলেন চিকিৎসক

আপনি হয়তো প্রতিদিনের মতো কাজ করছেন, স্বাভাবিক খাবার খাচ্ছেন, ঠিকঠাক ঘুমাচ্ছেন তবু অজান্তেই আপনার লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোনও ব্যথা নেই, জ্বর নেই, বড় কোনো উপসর্গও নেই। কিন্তু শরীরের ভেতরে নীরবে কাজ করে যাচ্ছে হেপাটাইটিস ভাইরাস। লক্ষণ প্রকাশ পেতে পেতে অনেক সময় দেরি হয়ে যায় তখন দেখা দেয় সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর, এমনকি লিভার ক্যানসার।

দেয়া সাক্ষাৎকারে মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. সৌরদীপ চৌধুরী জানিয়েছেন, ভারতে হেপাটাইটিস বি ও সি–এর সংক্রমণ বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই রোগটি নিয়ে মানুষ খুব কমই জানে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো অনেকেই জানেন না যে তারা সংক্রমিত। কারণ এই ভাইরাস বহু বছর সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। শরীরে বড় ধরনের ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নাও দেখা দিতে পারে।

হেপাটাইটিস কীভাবে ছড়ায়

হেপাটাইটিস বি ও সি সাধারণত ছড়ায়—

  • দূষিত সূঁচ বা সিরিঞ্জ ব্যবহারে
  • রক্ত সঞ্চালনের সময় স্ক্রিনিং না করা রক্তের মাধ্যমে
  • অপারেশন বা ডেন্টাল চিকিৎসায় অপরিষ্কার যন্ত্রপাতি ব্যবহারে
  • ট্যাটু বা পিয়ার্সিংয়ের সময় জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম ব্যবহার না করলে
  • মায়ের শরীর থেকে শিশুর মধ্যে

একটি বড় ভুল ধারণা হলো একসঙ্গে খাওয়া, আলিঙ্গন, কাশি বা সাধারণ স্পর্শে হেপাটাইটিস ছড়ায়। চিকিৎসকদের মতে, এটি সম্পূর্ণ ভুল এবং এই ভ্রান্ত ধারণাই অযথা সামাজিক লজ্জা তৈরি করে।

চিকিৎসা না নিলে যেসম সমস্যা হয়: চিকিৎসা ছাড়া দীর্ঘদিন হেপাটাইটিস বি বা সি থাকলে—

  • লিভারে ফাইব্রোসিস ও সিরোসিস হতে পারে
  • হেপাটোসেলুলার কার্সিনোমা (লিভার ক্যানসার) হতে পারে
  • লিভার ফেইলিওরের ঝুঁকি বাড়ে

চিকিৎসা

হেপাটাইটিস ভয়াবহ রোগ তবে এটা সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিলে সুস্থ থাকা সম্ভব। হেপাটাইটিস সি এখন ওষুধে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের ওরাল মেডিকেশনেই সেরে ওঠা সম্ভব। তবে শর্ত একটাই সময়মতো শনাক্ত করতে হবে। হেপাটাইটিস বি–এর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

ডা. সৌরদীপ চৌধুরীর মতে, টিবি বা এইচআইভির মতো দৃশ্যমান প্রচার না থাকায় হেপাটাইটিস নিয়ে সচেতনতা কম। নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের অভাব, সামাজিক কুসংস্কার ও ভুল ধারণার কারণে অনেকে পরীক্ষা করান না। অনেকেই ভাবেন শুধু মদ্যপানকারীদেরই লিভারের রোগ হয়, যা একেবারেই সঠিক নয়।

বর্তমানে হেপাটাইটিস পরীক্ষা খুবই সহজ একটি সাধারণ রক্তপরীক্ষাই যথেষ্ট। খরচও তুলনামূলক কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনে কখনো ইনজেকশন, অপারেশন, রক্ত সঞ্চালন বা বড় কোনো চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে গেলে অন্তত একবার হেপাটাইটিস পরীক্ষা করানো উচিত। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে ভ্যাকসিন রয়েছে। আর হেপাটাইটিস সি নিরাময়যোগ্য তাই দেরি না করে পরীক্ষা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

হেপাটাইটিস নীরব ঘাতক। লক্ষণ না থাকলেও এটি ধীরে ধীরে লিভারকে ধ্বংস করতে পারে। তাই সুস্থ অনুভব করলেই যে সব ঠিক আছে এমনটা ধরে নেয়া বিপজ্জনক। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সচেতনতা এবং সঠিক চিকিৎসাই পারে এই নীরব সংকট থেকে রক্ষা করতে। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে ভ্যাকসিন নেয়াও গুরুত্বপূর্ণ।