পেটের ক্যান্সার শুনলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে নির্দিষ্ট কিছু উপসর্গ বা সহজে শনাক্তযোগ্য একটি রোগের ধারণা। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি অনেক ভিন্ন। পেটের ক্যান্সারের উপসর্গ, বৃদ্ধি, কারণ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি অন্যান্য ক্যান্সারের তুলনায় আলাদা বৈশিষ্ট্য বহন করে। কিছু ক্যান্সার ধীরে ধীরে বাড়ে এবং প্রায় উপসর্গহীন থেকে যায়, আবার কিছু ক্যান্সার অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, পেটের কয়েকটি বিরল হলেও আক্রমণাত্মক ক্যান্সারের ধরন রয়েছে, যেগুলো দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করে।
অ্যাডেনোকার্সিনোমা: সবচেয়ে বেশি দেখা যায়
“পেটের ক্যান্সার” বললেই সাধারণত অ্যাডেনোকার্সিনোমাকেই বোঝানো হয়। মোট পেটের ক্যান্সারের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই এই ধরনের। এটি মূলত পাকস্থলীর আবরণে থাকা শ্লেষ্মা ও হজমরস উৎপাদনকারী কোষ থেকে তৈরি হয়।
অ্যাডেনোকার্সিনোমার আবার দুটি ধরন রয়েছে।
ইনটেস্টাইনাল অ্যাডেনোকার্সিনোমা ধীরে বাড়ে এবং অনেক সময় নির্দিষ্ট জিনের মিউটেশনের কারণে নতুন লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধে সাড়া দেয়। এটি সাধারণত হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত।
ডিফিউজ অ্যাডেনোকার্সিনোমা দ্রুত ও অনিয়মিতভাবে বেড়ে ওঠে, ফলে চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে। এটি তরুণদের মধ্যেও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
প্রধান উপসর্গগুলো হলো অল্প খাবার খেয়েই পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি, হজমে গ্যাঁজলা, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা, অজানা কারণে ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদি।
লিম্ফোমা সাধারণত লিম্ফ নোডে হয়, তবে পাকস্থলী থেকেও শুরু হতে পারে। এটিকে বলা হয় প্রাইমারি গ্যাস্ট্রিক লিম্ফোমা। মোট পেটের ক্যান্সারের প্রায় ৫ শতাংশ এমন ধরনের, যা অ্যাডেনোকার্সিনোমা থেকে ভিন্ন। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক ক্ষেত্রেই এটি চিকিৎসাযোগ্য।
এটির দুটি ধরন আছে।
এমএএলটি (মিউকোসা অ্যাসোসিয়েটেড লিম্ফয়েড টিস্যু) লিম্ফোমা ধীরে ধীরে বাড়ে এবং সাধারণত এক জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। এটি হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ডিফিউজ লার্জ বি-সেল লিম্ফোমা (ডিএলবিসিএল) অপেক্ষাকৃত গুরুতর এবং দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন।
উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে বারবার পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা, ওজন হ্রাস, বুকজ্বলা, বমি ইত্যাদি।
জিআইএসটি: বিরল হলেও মারাত্মক
গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল স্ট্রোমাল টিউমার বা জিআইএসটি খুবই বিরল ধরনের ক্যান্সার, যা পাকস্থলীর দেয়ালের বিশেষ স্নায়ুকোষ থেকে উৎপন্ন হয়। এগুলো আসলে সফট টিস্যু সারকোমার একটি ধরন।
প্রাথমিক পর্যায়ে তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে টিউমার বড় হলে পেটে গিট্টি বা ব্যথা, মলের সঙ্গে রক্ত, অবসাদ, রক্তবমি এবং অজানা কারণে ওজন কমে যাওয়া দেখা যায়।
চিকিৎসায় লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ যেমন ইমাটিনিব ভালো সাড়া দেয়। পাশাপাশি অস্ত্রোপচারও কার্যকর ভূমিকা রাখে। জিআইএসটি পুরো গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ট্র্যাক্টে হতে পারে, তবে প্রায় ৬০ শতাংশই পাকস্থলীতে এবং ৩০ শতাংশ ক্ষুদ্রান্ত্রে দেখা যায়।
কারসিনয়েড টিউমার: নীরব ঘাতক
পেটের কারসিনয়েড টিউমারকে বলা হয় নীরব ঘাতক। প্রাথমিক পর্যায়ে এগুলোতে উপসর্গ তেমন দেখা যায় না। তবে পরবর্তী সময়ে পেটের ক্র্যাম্প, মলত্যাগে পরিবর্তন, ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, ডায়রিয়া, ওজন হ্রাস, বমি বমি ভাব এবং বুকজ্বলা হতে পারে।
প্রাথমিকভাবে ছোট টিউমার এন্ডোস্কোপিক অস্ত্রোপচারে সরানো সম্ভব। বড় বা ছড়িয়ে পড়া টিউমারের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি, লক্ষ্যভিত্তিক ওষুধ বা বিশেষ কিছু লিভার-ভিত্তিক চিকিৎসা প্রযোজ্য হয়।
স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা: বিরল ও আক্রমণাত্মক
এটি পেটের সবচেয়ে বিরল ক্যান্সার। এখন পর্যন্ত চিকিৎসা-সাহিত্যে শতাধিকেরও কম কেস নথিভুক্ত হয়েছে। সাধারণত ত্বক, ফুসফুস বা খাদ্যনালীতে দেখা গেলেও খুব কম ক্ষেত্রে পাকস্থলীতে দেখা যায়।
পাকস্থলীর গ্রন্থিযুক্ত কোষে আলসার ও অ্যাসিড রিফ্লাক্সের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি খাদ্যনালীর নিচ থেকে শুরু হয়ে পাকস্থলীতে ছড়িয়ে পড়ে।
উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে বারবার পেটব্যথা, রক্তস্বল্পতা ও অকারণে ওজন হ্রাস। এই ক্যান্সার অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হওয়ায় চিকিৎসায় সাধারণত বড় অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপির প্রয়োজন হয়।
পেটের ক্যান্সার একটি জটিল ও বহুমাত্রিক রোগ। এর সব ধরনের ক্যান্সার একইভাবে বাড়ে না বা একইভাবে চিকিৎসাযোগ্য নয়। কিছু ক্যান্সার ধীরে বাড়ে, আবার কিছু হঠাৎ করেই ভয়াবহ আকার ধারণ করে। তাই অল্প উপসর্গ পেলেও দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা হলে এই ভয়ংকর রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
নারীদেহের একটি স্পর্শকাতর অঙ্গ স্তন। নানা শারীরিক জটিলতার সঙ্গে এটি সম্পর্কযুক্ত। নানা কারণে নারীর স্তনে ব্যথা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যা ‘মাস্টালজিয়া’ নামে পরিচিত। প্রায় সববয়সী নারীই এই সমস্যায় ভুগতে পারেন।
হালকা অস্বস্তি থেকে শুরু করে এই ব্যথা তীব্র ও তীক্ষ্ম হতে পারে। বেশিরভাগ নারীই স্তন ব্যথার ব্যাপারটিকে এড়িয়ে যান। খুব একটা গুরুত্ব দেন না কিংবা লজ্জায় লুকিয়ে রাখেন। অথচ এই অঙ্গটির ব্যথা একজন নারীর জীবনযাত্রার মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
স্তন ব্যথার নানা প্রকারভেদ রয়েছে। কেন এই ব্যথা হয়? স্তন ব্যথার লক্ষণ কী? চলুন এসম্পর্কিত তথ্য জেনে নিই এই প্রতিবেদনে-
স্তনে ব্যথার প্রকারভেদ:
ফ্রিকোয়েন্সি বা স্পন্দনহারের ওপর ভিত্তি করে, স্তন ব্যথাকে দুটি প্রধান বিভাগে ভাগ করা যায়:
১. চক্রাকার: এই ধরনের ব্যথার সঙ্গে মাসিক চক্র সম্পর্কিত। উভয় স্তনে এই ব্যথা হয়। প্রায়ই মাসিক বা পিরিয়ড শুরু হওয়ার কদিন আগে স্তন ব্যথা শুরু হয় এবং পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর কমে যায়। ২০-৪০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
২. অ-চক্রীয়: এমন ব্যথার সঙ্গে পিরিয়ডের কোনো সম্পর্ক নেই। যেকোনো স্তনে এই ব্যথা দেখা দিতে পারে। এটি ধ্রুবক বা বিরতিহীন হতে পারে। একই স্থানে ব্যথা হতে পারে আবার ছড়িয়ে যেতে পারে। আঘাত, অস্ত্রোপচারের হস্তক্ষেপ, সংক্রমণ ইত্যাদি কারণে স্তনে অ-চক্রীয় ব্যথা হতে পারে।
স্তনে ব্যথার লক্ষণ:
স্তনে ব্যথার নানা উপসর্গ রয়েছে। এর কিছু লক্ষণ হলো:
- স্তন অঞ্চলে কোমলতা বা ব্যথা
- জ্বালাপোড়া বা কাঁপার অনুভূতি
- স্তনে নিবিড়তা
- তীক্ষ্ণ ব্যথা
- স্তন ফোলা বা ভারী হওয়া
- অস্বস্তি যা বগল বা বাহুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে
স্তনে ব্যথার কারণ:
১. হরমোনের ওঠা-নামার কারণে স্তনে ব্যথা হতে পারে:
স্তন ব্যথার সঙ্গে হরমোনের পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। পিরিয়ডের সময় হরমোনের ওঠানামার কারণে স্তনে ব্যথা বা কোমলতা দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে পিরিয়ডের আগে। কিশোরী মেয়েদের পিরিয়ড হওয়ার আগে ও পরে স্তনে হালকা ব্যথা হয়। দেহে হরমোনের পরিবর্তনের কারণেই এ ব্যথা হয়ে থাকে। এতে ভয়ের কোনো কারণ নেই। পিরিয়ড শেষ হয়ে গেলে এ ব্যথা আর থাকে না।
এছাড়াও গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে স্তনে ব্যথা বা সংবেদনশীলতা হতে পারে। অনেকসময় মেনোপজের সময় হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ায় স্তনে ব্যথা হতে পারে। কিছুক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, পিল বা হরমোন থেরাপির কারণে স্তনে ব্যথা হতে পারে।
২. আঘাতের কারণে স্তনে ব্যথা হতে পারে:
আঘাতের কারণে কিংবা অন্য অন্য কারণেও স্তনে ব্যথা হতে পারে। বুকের পেশীতে চাপের কারণে এমন ব্যথা হতে পারে। আবার ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসের কারণে স্তনের সংক্রমণ হতে পারে। যা স্তনে ব্যথা বা প্রদাহ সৃষ্টি করে।
৩. গর্ভধারণের সময় নারীদের স্তনে ব্যথা হতে পারে:
গর্ভকালীন গর্ভধারণের সময় নারীরা স্তনে ব্যথা অনুভব করতে পারেন। সাধারণত গর্ভবতীর গর্ভাবস্থা তিন মাস চলাকালীন স্তনে ব্যথা হওয়া শুরু হয়। তখন স্তনের আকার বৃদ্ধি পায় এবং অনেক সময় স্তনের ওপর দিয়ে নীলশিরা দেখা যায়। কারণ তখন দেহে অনেক বেশি পরিমাণে রক্ত প্রবাহ হতে থাকে ও হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। অনেকসময় নারীদের স্তনে প্রদাহজনিত সমস্যা হয়। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া অথবা ফাঙ্গাসের আক্রমণে এমনটা হয়ে থাকে। গর্ভাবস্থায় এই বিষয়ে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এই ব্যথা থেকে জ্বরও আসতে পারে। এমনটা হলে দ্রুত ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
৪. স্তনে সিস্ট হলে ব্যথা হতে পারে:
স্তনের ভেতর এক ধরনের সিস্ট হতে পারে। এই সিস্টের ভেতর তরল জাতীয় পদার্থ থাকে যার নাম ব্রিজসিস্ট। স্তনের গ্রন্থি যখন বৃদ্ধি পায় তখন অনেকসময় এ সিস্ট দেখা দেয়। সিস্টের কারণে স্তনে ব্যথা হয়। এই সিস্টের আকার বৃদ্ধি পেলে স্তনে হাত দিলেও সিস্ট অনুভব করা যায়। এমনটা হলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৫. স্তন্যদানের সময় ব্যথা হতে পারে:
মা হওয়ার পর সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ও অনেকের স্তনে ব্যথা হয়ে থাকে। এজন্য বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর আগে ও পরে সব সময় স্তন পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। এতে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া অথবা ফাঙ্গাস হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। অনেক সময় স্তনে ঘা হয়ে থাকে যার কারণেও স্তনে ব্যথা হয়। স্তনের নিপল বা বোঁটায় ব্যাকটেরিয়া দেখা দিলে এবং বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর সময় ভাইরাস আক্রমণ করলে ব্যথা হতে পারে।
এছাড়াও বুকে ব্যথার একটি মারাত্মক কারণ হলো স্তন ক্যানসার। দীর্ঘদিন ধরে যদি স্তনে ব্যথা হয়, সেসঙ্গে স্তনে চাকা অনুভব করেন, স্তনের বোঁটা থেকে পুঁজ বের হয় তাহলে দ্রুত একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
(এই লেখাটি স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে লেখা। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত)